Select Page
“হাতকাটা” বাস্তব ও শৈল্পিক জগতের এক অমীমাংসিত আখ্যান : একটি বৌদ্ধিক আলোচনা

বিতান চক্রবর্তী তাঁর “হাতকাটা” উপন্যাসিকায় বর্তমান ঝাঁ চকচক শপিংমল আর ডিজিট্যাল ইন্ডিয়া যুগের দুই যুবকের জীবন-সংগ্রামকে ধরতে চেয়েছেন প্লট হিসেবে। কনক ও শুভ এক জ্বলন্ত জীবন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে পথ হাঁটে। প্রতিদিনের হিসেব তাদের বুঝিয়ে দেয় ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় মালিক শ্রেণি ক্রমাগত এক্সপ্লয়েট করে চলেছে তাদের। টিকে থাকার লড়াইয়ে (survival of the fittest) তারা শ্রম বিক্রি করে, বিক্রি করে স্বপ্ন। মার্ক্সের সূত্র ধরে এ উপন্যাসিকার হতাশা ও স্বপ্নভঙ্গের নিদারুণ চিত্রকে ব্যাখ্যা করাই যায়। ব্যাখ্যা করাই যায় অর্থ কীভাবে শক্তিশালী করে তোলে একজন মানুষকে, যে ঠান্ডা ঘরে বসে আর একজন মানুষকে হুমকি দেয় কাজ চলে যাওয়ার। অর্থ কীভাবে গড়ে তোলে শ্রেণিবৈষম্য। একজন কীভাবে একের পর এক শপিংমল, পাঁচতারা হোটেল বানায় আর অন্যজন দিনের শেষে মেস মালিকের সামান্য ১৫০০ টাকা দিতে পারে না, নিজেকে আত্মঘাতের পথে টেনে নামায়। এ এক ভিন্ন ডিসকোর্স। এ আলোচনায় পরে একদিন আসা যাবে। এখানে যে কথা বলতে চাইছি তা হল কনক ও শুভ আসলে আমাদের বর্তমান সময়ের প্রতিচ্ছবি। বাস্তব এই চরিত্রের মধ্যে দিয়ে আরও শাণিত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে আমাদের সামনে। কনক ও শুভ আসলে আমি নিজে, ওরা আসলে আমার পাশের বাড়ির ভাই, ওরা আসলে আমার বন্ধু, আমার পরিচিত, অপরিচিত বর্তমান সময়ের প্রতিভূ। এই প্রসঙ্গে D. H. Lawrence -এর ‘Why the Novel Matters’ প্রবন্ধটির কথা বিশেষভাবেই উল্লেখযোগ্য। Lawrence উপন্যাসে জীবনের চিত্রায়ণকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আর উপন্যাসে জীবন এতখানি মুখ্য হয়ে ওঠে বলেই তা আমাদের উপর প্রভাব (impact) ফেলতে পারে।

“But in the novel you can see, plainly, when the man goes dead, the woman goes inert. You can develop an instinct for life, if you will, instead of a theory of right and wrong, good and bad.”

(From Lawrence’s ‘Why the Novel Matters’)

আবার Henry James তাঁর “The Art of Fiction” প্রবন্ধেও বলছেন উপন্যাসের প্রধান চরিত্রই হল জীবনের প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠা এবং তিনি বলছেন উপন্যাস শুধু অভিজ্ঞতাজাত নয় বরং তা একটি শৈল্পিক বিকাশ। এই দুই কিংবদন্তী ঔপন্যাসিকের দুটি প্রবন্ধই একটি টেনশনকে উসকে দেয় : জীবন (অথবা বাস্তব) বনাম শিল্প। অর্থাৎ জীবনকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হতে হয় উপন্যাসে। আবার সেই শৈল্পিক জগৎ হয়ে উঠবে বাস্তবের প্রতিচ্ছবি। বাস্তব ও শিল্পের এই টানাপোড়েন কতখানি সফল হয়ে উঠবে তাই নির্ধারণ করে একটি উপন্যাস/উপন্যাসিকার হয়ে ওঠা। শুভ ও এক ঋণের দায়ে দেউলিয়া উকিলের ছেলের কথোপকথন যখন পড়ি তখন এই আলোচনাসভায় শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের defamiliarization-এর ব্যাখ্যার সাথে দ্বিমত পোষণের ধৃষ্টতা দেখাতে ইচ্ছে করে (অন্তত উনি যদি রাশিয়ান ফর্মালিস্টরা যে অর্থে defamiliarization কে ব্যবহার করেছেন সেই অর্থেই করে থাকেন):

— দাঁড়া তো, সরিয়ে নেব! বালের টিকিট সব। তিনদিন তোদের সিরিজের খেলাই হচ্ছে না।
— আরে দাদা আমি কী করে জানব কোন সিরিজের পুরস্কার উঠবে? আমি তো ভগবান নই!
— ওসব চুদুরবুদুর ছাড়ো, তোমরা শালা ঢ্যামনা। আমি তোদের টিকিট চেক করাব। জাল হলে সোজা পুলিশে দেবো।
… … …
— গালি… শালা তোর মাকে… জাল টিকিট বেচিস… আয় বাইরে আয়, দেখাচ্ছি তোকে…

(পৃষ্ঠা ৩১)

অথবা কনকের সহকর্মী যখন কনকে বলে

শোনো। ওর সাথে সিনে যেয়ো না। কাজ শেষ হলেই এক লাথ মারবে, স্টক থেকে আউট অফ স্টক করে ছেড়ে দেবে।
(পৃষ্ঠা ২২)

এই সংলাপ আমাদের চারপাশের, আমাদের মুখের ভাষাকে লেখক টেনে নামিয়েছেন তাঁর উপন্যাসের পাতায়। তাহলে কী করে “হাতকাটা”-কে উপন্যাস বলতে পারি আমরা?(!) কী করে একে বলতে পারি শিল্প? বরং একে এই কঠিন ও জ্বলন্ত সময়ের ইতিহাস বলাই উচিৎ নয় কি? এইখানেই একটি টেনশন চলতে থাকে আমাদের মধ্যে। কারণ উপন্যাসের পাতায় আমরা যা পড়ছি তা আমাদের চারপাশের রূঢ় বাস্তব। এবং তা কিন্তু শৈল্পিক নয়। আমার মনে হয়েছে এই সমগ্র উপন্যাসিকাটির উপন্যাসিকা হয়ে ওঠা ৯ নং অধ্যায়ের একটি ছোট্ট খুঁজে পাওয়ার উপর দাঁড়িয়ে আছে। আর এই খুঁজে পাওয়ার পরই পাঠক অনুভব করে কনক ও শুভ বাস্তব অথচ বাস্তব নয়, সত্যি তারা আমাদের সিম্বল কিন্তু তাদের ছোঁয়া যায় না কারণ এরপর তারা ক্রমশ শৈল্পিক ঘটনাক্রমের দিকে ঝুঁকে পড়ে। প্রবাবিলিটি ও নেসেসিটির সূত্র মেনে লেখক এমন ভাবে তাঁর ঘটনাক্রমকে সাজিয়ে দেন যে সমগ্র প্লটটি একটি সরু সুতোর উপর দোল খায় যার এক দিকে বাস্তব অন্যদিকে শিল্প। ফলে ক্রমশ এই উপন্যাসিকা হয়ে ওঠে বাস্তবের শিল্প বা শিল্পের বাস্তব। কোনও একটিকে একমাত্র চিহ্ন হিসেবে মেনে নিতে পারি না আমরা। অস্বীকার করতে পারি না যে এ বাস্তব নয়, আবার এ যে বাস্তব তাও জোর দিয়ে বলা যায় না কারণ বাস্তবকে ছাড়িয়ে এক অন্য বিস্ময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। এই অমীমাংসিত টেনশনই আসলে শিল্পের ব্যাকবোন। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর একমাত্র শক্তি। লেখক বিতান চক্রবর্তী যে সেই সরু সুতোর উপর দিয়ে যথাযথ ব্যালান্স করে হাঁটতে পেরেছেন তাতেই এটি একটি উপন্যাসিকা হয়ে উঠতে পেরেছে।

18 Comments

  1. film modu

    Way cool! Some very valid points! I appreciate you writing this post and also the rest of the site is extremely good. Norry Hakim Shiroma

    Reply
  2. shizue jondrow

    Thanks again for the article. Really Cool.

    Reply
  3. shakita wahington

    I like a very useful article, I like our page and follow it

    Reply
  4. jarred easley

    You produce quality content, congratulations on this

    Reply
  5. AqwsEurot

    canadian mail order pharmacy ed meds canada online pharmacy

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *